ইন্টারনেট

বিটকয়েন

March 4, 2019

বিটকয়েন

আমরা সবাই কোন না কোন ভাবে বিটকয়েন শব্দটির সাথে কমবেশি পরিচিত। বিটকয়েন নিয়ে প্রযুক্তির জগতে মাতামাতির শেষ নেই। কিন্তু কেন এই মাতামাতি? কি আছে এই বিটকয়েনে? চলুন জেনে নিই বিটকয়েন সম্পর্কে নানা জানা অজানা চমকপ্রদ তথ্য

বিটকয়েন কী

বিটকয়েন হচ্ছে এক ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা যাতে এনক্রিপশন কৌশল ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে একক মুদ্রা উৎপাদন করা হয় এবং এর তহবিল স্থানান্তর যাচাই করা হয়। এই ধরনের মুদ্রাকে ক্রিপ্টোকারেন্সি বলা হয়। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করে থাকে। সাধারণ মুদ্রার মতো একে ধরা বা ছোঁয়া যায় না। বিনিময় করা যায় যে কোন ধরনের ঝুট-ঝামেলা ছাড়াই। এ কারণেই এত অল্প সময়ে বিটকয়েন হয়ে উঠেছে এতটা জনপ্রিয়।

ক্রিপ্টোকারেন্সি কী?

ক্রিপ্টোকারেন্সি হচ্ছে এমন কিছু কম্পিউটার কোড যাদের আর্থিক মূল্য রয়েছে। এই কোড গুলো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার ব্যবহার করে তৈরি করা হয়ে থাকে। এই কোড গুলো তৈরি করা হয় জটিল সব গাণিতিক হিসাব নিকাশ দ্বারা। সম্পূর্ণ পদ্ধতির উপর নজরদারি করার জন্য রয়েছে লক্ষাধিক কম্পিউটার ব্যবহারকারী। এদের বলা হয় মাইনার।

ক্রিপ্টো শব্দটি এসেছে ক্রিপ্টোগ্রাফি থেকে। শব্দটি দ্বারা ক্রয় বিক্রয়ের জন্য কোডগুলোর লেনদেনের নিরাপত্তা পদ্ধতি কে বুঝায়। বিটকয়েন সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি হলেও আরও নানা ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি রয়েছে। ইথিরিয়াম তার মধ্যে একটি।

বিটকয়েনের উদ্ভাবন

বিটকয়েন হচ্ছে প্রায় ৯ বছর আগে ২০০৯ সালে শুরু হওয়া একটি ভার্চুয়াল লেনদেন ব্যবস্থা। বাংলাদেশে প্রচলন না থাকলেও ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সমগ্র বিশ্বে এ লেনদেন ব্যবস্থা। এর উদ্ভাবককে এই নিয়ে এতদিন জল্পনা কল্পনা ছিল সমগ্র প্রযুক্তি বিশ্বে। এই জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিটকয়েন এর উদ্ভাবক হিসেবে নিজেকে দাবি করেছেন একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিক। বিটকয়েন এর উদ্ভাবক এতদিন সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামে নিজের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন। ক্রেইগ রাইট দাবি করেন সাতোশি নাকামোতো তারই ছদ্মনাম। বিটকয়েন ডেভলপার গ্যাভিন এন্ডারসন দাবি করেন যে তিনি ৯৮ ভাগ নিশ্চিত যে ক্রেইগ ই হচ্ছেন সাতোশি নাকামোতো। কিন্তু ক্রেইগ রাইটের এ দাবি ক্রিপ্টোকারেন্সি কমিউনিটিতে দ্রুতই সন্দেহের উদ্রেক ঘটায়। তিনি দাবি করেন যে তিনি প্রথম চাবিটির প্রমাণপত্র প্রকাশ করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সমালোচনার ঝড়ের মুখে পড়ে তিনি সরে আসেন।

বিটকয়েনকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে সাতোশি নাকামোতো একা কাজ করেননি। হাল ফিনে, “সাইফারপাংক মুভমেন্ট” এর প্রথমদিককার সদস্য, দাবি করেন যে ক্রিপ্টোকারেন্সি মেইলিং লিস্ট থেকে তিনি সাতোশি নাকামোতো এর বিটকয়েনের আবেদন আবিষ্কার করেন। ২০১৩ সালের একটি ব্লগ পোস্টে হাল ফিনে বিকেন্দ্রীভূত অনলাইন মুদ্রা এর ব্যাপারে তার প্রচুর আগ্রহ প্রকাশ করেন। যখন সাতোশি নাকামোতো প্রথম সফটওয়্যার বের করার ঘোষণা দেন, তখন হাল ফিনে ব্লক ৭০ হতে প্রথম দশটি বিটকয়েন মাইন করার প্রস্তাব দেন যা সাতোশি পরীক্ষামূলক ভাবে ব্যবহার করার জন্য প্রেরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে হাল ফিনে বিটকয়েন ফোরাম এ তার সর্বশেষ পোস্ট বলেন যে সাতোশি নাকামোতো এর আসল পরিচয় এখনো তার কাছে একটি রহস্য। এরপর বিভিন্ন সময়ে নিক সাবো এর মতো আরও অনেকেই বিটকয়েনের উদ্ভাবক হিসেবে নিজেকে দাবি করলেও আসল সাতোশি নাকামোতোকে এ ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কে এই ক্রেইগ রাইট?

১৯৭০ সালে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেইন এ জন্মগ্রহণ করেন এই কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং ব্যবসায়ী। তার পুরো নাম ক্রেইগ স্টিভেন রাইট। তিনি ১৯৮৭ সালে ব্রিসবেইন এর পাডুয়া কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। পরে তিনি চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে “দ্যা কোয়ান্টিফিকেশন অফ ইনফরমেশন রিস্ক” এর উপর পিএইচডি এর কাজ করেন। চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয় ফোর্বস ম্যাগাজিনকে জানায় যে ক্রেইগ স্টিভেন রাইট এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটো মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অবশেষে তিনি পিএইচডি ডিগ্রীটি অর্জন করেন। ক্রেইগ রাইট অনেকগুলো বইও লিখেছেন। । তিনি নিউ সাউথ ওয়েলস এর ইউনাইটিং চার্চ এর ট্রাস্টি ও ছিলেন। কর্মজীবনে বিভিন্ন কোম্পানির জন্য কাজ করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো অজিইমেইল, কে-মার্ট এবং অস্ট্রেলিয়ান সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ। তিনি ভারতীয় মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি মাহিন্দ্রা ও মাহিন্দ্রা এর নিরাপত্তা পরামর্শক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি লাসেটার’স অনলাইন নামে পৃথিবীর প্রথম অনলাইন ক্যাসিনো এর স্থাপত্যের নকশা প্রস্তুত করেন। বিডিও কেনডালস নামক একাউন্টিং ফার্ম এর ইনফরমেশন সিস্টেমস ম্যানেজার এর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

২০০৪ সালে আদালত অবমাননার দায়ে সাউথ ওয়েলস সুপ্রিম কোর্টে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। এতে তার ২৮ দিনের জেল হয়। রাইট হটওয়্যার প্রিইম্পটিভ ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ নামের একটি টেকনোলজি ফার্ম এর চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই ফার্মের মাধ্যমে তিনি পৃথিবীর প্রথম বিটকয়েন ভিত্তিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ান ট্যাক্স অফিসের নানা জটিলতার কারণে ২০১৪ সালে এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। ক্রেইগ রাইট ডিমরগ্যান লিমিটেড নামক ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। সাইবার সিকিউরিটি এবং কম্পিউটার ফরেনসিক কোম্পানি প্যানোপ্টিক্রিপ্ট পিটিওয়াই লিমিটেড এর প্রতিষ্ঠাতাও তিনি।

কেন উদ্ভাবকের এত গোপনীয়তা?

অনেকেই ভাবতে পারেন এরকম যুগান্তকারী একটি উদ্ভাবন এর উদ্ভাবক কেন নিজের পরিচয় গোপন রাখতে চান। এর কারণ হচ্ছে পূর্বে এরকম নতুন মুদ্রা ব্যবস্থার উদ্ভাবকদের তাদের উদ্ভাবনের কারণে ভোগ করতে হয়েছে কঠিন ফলাফল। ১৯৯৮ সালে হাওয়াইয়ের বাসিন্দা বার্নার্ড ভন নটহস “লিবার্টি ডলার” আবিষ্কার করার কারণে যুক্তরাষ্ট্রীয় আইন ভঙ্গের অভিযোগে ছয় মাসের গৃহবন্দিত্ব এবং তিন বছরের প্রবেশন ভোগ করেন। ২০০৭ সালে প্রথম ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবস্থা গুলোর একটি “ই গোল্ড” কে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে বন্ধ করে দেয়া হয়। এ ধরনের আইনি মারপ্যাঁচ থেকে রক্ষা পেতেই সাতোশি নাকামোতো গোপন পরিচয়ে বিটকয়েন এর কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

বিটকয়েন নিয়ে কেন এত সমালোচনা?

বিটকয়েনকে এত জনপ্রিয় করার পেছনে হাত রয়েছে অপরাধীদের। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই শুনেছেন। বিটকয়েন আইনি বেড়াজাল মুক্ত হওয়ায় একে সহজে বিভিন্ন অপরাধ কর্মে আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ব্যবহার করা যায়। এই ব্যাপারটি অপরাধীদের নজরে এলে ২০১১ থেকে ২০১৩ সালে অপরাধীদের মাঝে এর প্রচুর বেচাকেনা শুরু হয়।

বিশেষ করে ইন্টারনেটের সাধারণ ব্যবহারকারী থেকে লুকানো অংশ যা ডার্ক ওয়েব নামে পরিচিত, এখানে বিটকয়েন এর লেনদেনের পরিমাণ হুট করে আকাশচুম্বী হয়ে যায়। কারণ এই ডার্ক ওয়েব ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব এর এখতিয়ারের বাইরে এবং এখানে নেই কোন আইনি তদারকি। ফলে অপরাধীদের জন্য ডার্ক ওয়েব একটি জনপ্রিয় জায়গা। এর ফলে খুব দ্রুত বেড়ে যায় বিটকয়েন এর মূল্য। অদক্ষ বিনিয়োগকারীরা কেলেঙ্কারির শিকার হয়ে হাজার হাজার ডলার হাতছাড়া হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এভাবে মূলত বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনার দ্বারা লোকমুখে প্রচলিত হয়ে উঠেছে বিটকয়েন শব্দটি।

কিভাবে কাজ করে বিটকয়েন?

বিটকয়েন সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল মুদ্রা। এটি লেনদেন বা সংরক্ষণের জন্য কোন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। এটি ধরা বা ছোঁয়া না গেলেও এর ব্যবহার সাধারণ মুদ্রাগুলোর মতই। অনলাইনে পণ্য এবং সেবা ক্রয়ের জন্য বিট কয়েন ব্যবহার করা হয়। ভবিষ্যতে মূল্যবৃদ্ধির আশায় অনেকে বিটকয়েন জমা করে রাখেন। পিয়ার-টু-পিয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে বিটকয়েন লেনদেন হয়ে থাকে। বিটকয়েন গুলো জমা থাকে ব্যবহারকারীর ওয়ালেট এ। ওয়ালেট হতে পারে অনলাইন ও অফলাইন দুই ধরণেরই। ওয়ালেট হচ্ছে এক ধরনের ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র ডাটাবেজ। এই ডাটাবেজ সংরক্ষণ করা যেতে পারে কম্পিউটার ড্রাইভ, স্মার্টফোনে, ট্যাবলেট কিংবা ক্লাউড স্টোরেজে। ওয়ালেট হিসেবে ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন এপ্লিকেশনও তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিটি ওয়ালেটের একটি সুনির্দিষ্ট অ্যাড্রেস থাকে। এই এড্রেস টি থাকে এনক্রিপ্টেড। এক এড্রেস থেকে আরেক এড্রেসে বিট কয়েন স্থানান্তরের মাধ্যমে এই মুদ্রা ব্যবস্থার লেনদেন হয়ে থাকে। প্রত্যেকটি লেনদেনের রেকর্ড থাকে ব্লকচেইন নামক এক উন্মুক্ত খতিয়ান ব্যবস্থায়। প্রতিটি লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর একটি করে বিটকয়েন যুক্ত হয় নেটওয়ার্কে। একে বিটকয়েন মাইনিং বলা হয়ে থাকে। বিটকয়েন লেনদেন ব্যবস্থায় ব্লকচেইন এবং বিটকয়েন মাইনিং দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ দুটো বিষয় সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান না থাকলে বিট কয়েন লেনদেন ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বোঝা সম্ভব নয়। তবে আমরা অত গভীরে যাবো না। চলুন সহজ ভাবে জেনে নেই এই দুটো বিষয় সম্পর্কে।

ব্লকচেইন

সাতোশি নাকামোতো ছদ্মনামের ব্যক্তির এক অসাধারণ উদ্ভাবন হচ্ছে ব্লকচেইন। উদ্ভাবনটি এতটাই যুগান্তকারী যে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মানুষের মুখে মুখে রটে গেলো এর নাম। ডিজিটাল তথ্য কে নকল করার বদলে বিতরণ করার ব্যবস্থা করে দিয়ে নতুন ধরনের ইন্টারনেট সৃষ্টি করে ব্লকচেইন টেকনোলজি। ব্লকচেইন মূলত তৈরি করা হয়েছিল বিটকয়েনের মত ডিজিটাল কারেন্সি গুলো লেনদেন করার কাজে ব্যবহার করার জন্য।

বোঝার সুবিধার্থে একাধিক কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অনুলিপি সম্বলিত একটি স্প্রেডশিট কে কল্পনা করুন। ধরুন এই নেটওয়ার্কে স্প্রেডশিট টি নিয়মিত আপডেট হচ্ছে। সহজ ভাষায় ব্লকচেইন  টেকনোলজিটি এরকমই। ব্লকচেইনের সংরক্ষিত তথ্য শেয়ারকৃত এবং সম্মিলিত এক ধরনের ডাটাবেইজে থাকে। ব্লকচেইনের ডাটাবেজ গুলো নির্দিষ্ট কোন স্থানে সংরক্ষিত থাকে না। অর্থাৎ সংরক্ষিত রেকর্ডগুলো সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং চাইলেই যে কেউ এটি যাচাই করতে পারে। রেকর্ড গুলো বিকেন্দ্রীভূত হওয়ায় হ্যাকাররা চাইলেও এগুলোকে নষ্ট করতে পারে না। লক্ষ লক্ষ কম্পিউটার নেটওয়ার্ক এ রেকর্ড গুলো কে ক্রমাগত পোস্ট করতে থাকে এবং এগুলো যে কোন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এক্সেস করতে পারেন।

বিটকয়েন মাইনিং

বিটকয়েন মাইনিং হচ্ছে এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে বিটকয়েন লেনদেন যাচাই করে ব্লকচেইন  নামক উন্মুক্ত খতিয়ানে এর রেকর্ড যুক্ত করা হয় এবং এর মাধ্যমে নতুন একটি বিটকয়েন মুক্ত হয়। ইন্টারনেট এবং সংশ্লিষ্ট হার্ডওয়্যার  ব্যবহার করে যে কেউ বিটকয়েন মাইন করতে পারে। বিটকয়েন লেনদেনে তথ্যগুলো ব্লকচেইনের ব্লকে সংকলন করে জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করা বিট কয়েন মাইনিং এর অন্তর্ভুক্ত। সমস্যা সমাধানকারী প্রথম ব্যক্তি ব্লকচেইন  এ একটি নতুন ব্লক যুক্ত করে নিজের পারিশ্রমিক বুঝে নেন। পারিশ্রমিকের মধ্যে রয়েছে লেনদেনের তথ্য সংকলন করার ফি এবং নতুন উন্মুক্ত করা বিটকয়েন। মাইন করা প্রতিটি ব্লকের ফলে উন্মুক্ত হওয়া বিটকয়েন গুলোকে মাইন রিওয়ার্ড বলা হয়ে থাকে।

প্রতি ২১০০০০ ব্লক পরপর অথবা প্ৰতি ৪ বছর পরপর মাইন রিওয়ার্ড অর্ধেক হতে থাকে। ২০০৯ সালে ব্লক রিওয়ার্ড ৫০ দিয়ে শুরু হয়। বর্তমানে ২০১৮ সালে এর পরিমাণ ১২.৫ । এভাবে ব্লক রিওয়ার্ড কমতে কমতে একসময় ২১ মিলিয়ন বিটকয়েন উন্মুক্ত হবে, যা বিটকয়েনের সর্বোচ্চ সংখ্যা। অনেকে হয়ত ভাবছেন বিট কয়েন মাইনিং এর গাণিতিক সমস্যাগুলো আসলে কতটুকু জটিল? এখানে একটি মজার ব্যাপার রয়েছে। সমস্যা গুলোর জটিলতা নির্ভর করে সমাধানকারীর ক্ষমতার উপর। প্রতি ২০১৬ টি ব্লক পরপর গাণিতিক সমস্যা গুলোর জটিলতা পরিবর্তিত হয়।

ব্লক উদ্ভাবনের সংখ্যা অপরিবর্তিত রাখতে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সমাধানকারী হার্ডওয়ারের সমাধান ক্ষমতা যত বাড়বে, সমস্যা গুলোর জটিলতা তত বাড়বে। আবার হার্ডওয়ারের সমাধান ক্ষমতা যত কমবে, সমস্যা গুলোর জটিলতা ততোই কমবে। এ পদ্ধতি অনুসরণ করে বিট কয়েন মাইনিং এ উন্মোচিত ব্লক গুলোর সংখ্যা অপরিবর্তিত রাখা হয়। ব্লক গুলো উন্মোচন করার জন্য প্রয়োজন অত্যাধিক প্রসেসিং ক্ষমতা সম্পন্ন হার্ডওয়্যার। প্রতিটি ব্লক উন্মোচিত হওয়ার সাথে সাথে মাইনিং নেটওয়ার্কে বার্তা চলে যায় এবং নেটওয়ার্কের ব্যবহারকারীগণ এটি যাচাই করেন।

প্রথমদিকে মাইনিং করার জন্য দৈনন্দিন ব্যবহারকৃত কম্পিউটার সিপিইউ ব্যবহার করা হতো। পরবর্তীতে দেখা যায় সিপিইউ হতে জিপিইউ মাইনিং কাজে অধিক সফল। ফলশ্রুতিতে মাইনিং কাজে জিপিইউ ক্রমেই অত্যধিক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে “এ এস আই সি” নামক হার্ডওয়্যার টি বিট কয়েন মাইনিং এর জন্য সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এটি বাজার প্রথম উন্মুক্ত করা হয় ২০১৩ সালে। পরবর্তীতে এর আরও অনেক উন্নত সংস্করণ বাজারে আসে। তবে নতুন হার্ডওয়্যার ব্যবহার করতে না পারলে বিটকয়েন মাইনিং করে খুব বেশি আর্থিক ভাবে লাভবান হওয়া যায় না। কারণ এতে প্রচুর বৈদ্যুতিক ক্ষমতা প্রয়োজন হয়।

বিটকয়েন এবং ব্লকচেইন  কতটুকু নিরাপদ?

অনেকে হয়তোবা ভাবছেন ধরা বা ছোঁয়া যায় না এমন একটি অর্থব্যবস্থা কতটুকু নিরাপদ? মনে এরকম প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক। প্রশ্নের উত্তরটাও দিয়ে দিচ্ছি।

প্রত্যেক ব্যবহারকারীর বিট কয়েন গুলো জমা থাকে তাদের নিজস্ব ওয়ালেটে। পূর্বেই এই ওয়ালেটের ধরন সম্পর্কে আমরা আলোচনা করেছি। প্রত্যেকটি ওয়ালেটের একটি করে অনন্য অ্যাড্রেস থাকে। এক ওয়ালেট থেকে আরেক ওয়ালেটে বিট কয়েন লেনদেন হলে সেটি ব্লকচেইন নামক উন্মুক্ত খতিয়ানে রেকর্ড হয়ে থাকে। এই ব্লকচেইনটি একটি সেলফ অডিটিং ইকোসিস্টেম। প্রতি দশ মিনিট পর পর এটি নিজে নিজেই আপডেট হয়। এ খতিয়ান সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকায় এখানে কোন ছলচাতুরী হওয়ার সুযোগ নেই। এ পদ্ধতির কারণে নকল বিটকয়েন সৃষ্টি অথবা লেনদেন নিয়ে ভুল তথ্য প্রদান করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।

কারণ ব্লকচেইনের ভিতরে কোন তথ্য অবৈধ ভাবে পরিবর্তন বা সংশোধন করতে হলে সম্পূর্ণ ব্লকচেইন কে একই সময়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতে হবে। এই কাজ করার জন্য যে পরিমাণ হার্ডওয়্যার ক্ষমতা প্রয়োজন তা অর্জন করা কোনভাবেই সম্ভব নয়। যদিও প্রতিটি বিটকয়েনে তার ওয়ালেট সংবলিত তথ্যাদি সংরক্ষিত থাকে, কিন্তু সেই ওয়ালেটের ব্যবহারকারীর কোন ব্যক্তিগত তথ্য বিটকয়েনে থাকে না। এর ফলে বিটকয়েন লেনদেনের তথ্যাদি ডিজিটাল উপায়ে যাচাই করা হলেও ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা রক্ষিত হয়। তবে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য না জানলেও তার ওয়ালেটের লেনদেনগুলোর সকল তথ্য নেটওয়ার্কের সবার কাছে থাকে। এর ফলে ব্যবহারকারীগণ বিটকয়েন ব্যবহার করে সহজে কোন অপরাধ কর্মে জড়িয়ে পড়েন না।

বিটকয়েন ব্যবহারের সুবিধা সমূহ

এত অল্প সময়ে বিটকয়েনের এত অধিক জনপ্রিয়তা অর্জনের পেছনে মূল কারণ গুলোর একটি হচ্ছে এটি ব্যবহারের অনন্য সুবিধা সমূহ। বিট কয়েন একটি প্রকৃত অর্থে বিকেন্দ্রীভূত মুদ্রা ব্যবস্থা। এতে কারো কোনও হস্তক্ষেপ নেই। সরকার, ব্যাংক বা অন্য কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাইলেও এর মূল্য পরিবর্তন করতে পারে না। প্রতিটি বিটকয়েনের মালিক ব্যবহারকারী নিজেই। এর জন্য তিনি সরকার বা ব্যাংকের কাছে কোনভাবেই দায়বদ্ধ নন। সরকার এবং ব্যাংকের প্রতি অবিশ্বাসের কারণে মানুষ ক্রমেই বিটকয়েনের এই বৈশিষ্ট্য পছন্দ করতে শুরু করে। এর জনপ্রিয়তার মূল কারণগুলোর আরেকটি হল এটি ব্যবহারের গোপনীয়তা। বিটকয়েন ব্যবহারকারী নিজের পরিচয় গোপন রেখে লেনদেন করতে পারেন। এতে ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।

বিট কয়েন ব্যবহারের জন্য একাউন্ট খোলার জন্য ব্যবহারকারীকে কোন ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হয় না। এই একাউন্ট খোলার জন্য দিতে হয়না কোন অতিরিক্ত ফি। বিটকয়েন লেনদেন খুবই দ্রুত করা যায়। মুহূর্তের মধ্যেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে বিট কয়েন স্থানান্তর করা যায়। এই লেনদেন প্রক্রিয়া খুবই স্বচ্ছ। প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড ব্লকচেইন ডাটাবেজে যুক্ত থাকে। ব্লকচেইন সকলের জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় এতে নেই কোনো কারচুপির সুযোগ। এত সুযোগ সুবিধা বিটকয়েন ছাড়া একক কোন মুদ্রা ব্যবস্থা প্রদান করতে পারে না বলে বিটকয়েনের এত জনপ্রিয়তা।

বিটকয়েন ব্যবহারের অসুবিধা সমূহ

পৃথিবীতে প্রতিটি জিনিসের কোন না কোন অসুবিধা রয়েছে। হোক সেটা যতটাই যুগান্তকারী। বিট কয়েন ও তার কোন ব্যতিক্রম নয়। এর হাজারো সুবিধার মাঝে রয়েছে কিছু অসুবিধাও। বিট কয়েন লেনদেনে কারো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এবং জবাবদিহিতার কোন ব্যবস্থা না থাকায় চাইলেই যে কেউ এটিকে অপরাধ কাজে ব্যবহার করতে পারে। ব্যবহারকারীর পরিচয় গোপন থাকায় চাইলেও সহজে কাউকে অপরাধ কাজের জন্য দোষী বলে প্রমাণ করা যায় না। এই সুযোগের অপব্যবহার করে তাই ডার্ক ওয়েবে অপরাধ কর্মের লেনদেনগুলো বিটকয়েন দ্বারাই হয়ে থাকে। বিটকয়েনের আরেকটি বিশাল অসুবিধা হচ্ছে এর মূল্যের অস্থিতিশীলতা। হঠাৎ একসময় এর মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে যায়, আবার কখনোবা মূল্য এসে পড়ে শূন্যের কাছাকাছি। তাই এতে বিনিয়োগ করা খুব একটা নিরাপদ নয়। বিটকয়েন একটি অফেরৎযোগ্য মুদ্রা ব্যবস্থা। ভুল করে একবার লেনদেন করে ফেললে এটি ফেরত পাবার আর কোন সুযোগ নেই। একটু সর্তকতা অবলম্বন করলেই বিটকয়েনের এই অসুবিধা গুলো থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব।

বিটকয়েনের মূল্য

বিটকয়েনের মূল্য খুবই অস্থিতিশীল। প্রতি মুহূর্তেই এর মূল্য পরিবর্তিত হয়। শুরুর দিকে এর বাজার মূল্য ছিল ০.৩২ ডলার। এটি প্রতি বছরই বাড়তে বাড়তে ২০১৭ সালে আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়ায়। এর মূল্য ১৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায় একসময়। এর বর্তমান বাজার মূল্য ৬৪০০ ডলারের কাছাকাছি। এমনও হতে পারে যে এই মূল্য আগামীকাল সকালে আকাশ পাতাল পরিবর্তিত হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ ও বিটকয়েন

এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ২০১৪ সালে বিটকয়েন ফাউন্ডেশন এর অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশ। তবে কিছুদিনের মধ্যেই বিটকয়েন এর উপর বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

কেন আমাদের বিটকয়েন সম্বন্ধে জানা প্রয়োজন?

বিট কয়েন হচ্ছে আধুনিক এক যুগান্তকারী মুদ্রা ব্যবস্থা। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে সব কিছুরই ডিজিটালাইজেশন ঘটছে। এই ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়া লাগবে আমাদের মুদ্রা ব্যবস্থাতেও। প্রযুক্তিবিদদের মতে অদূর ভবিষ্যতে ডিজিটাল কারেন্সি-ই হবে লেনদেনের একমাত্র মাধ্যম। নানা আইনি জটিলতার কারণে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে বিটকয়েনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি থাকলেও আশা করা যায় ভবিষ্যতে এটি একটি প্রচলিত মুদ্রা ব্যবস্থা হিসেবে সুপরিচিতি পাবে। তাই প্রযুক্তির বিপ্লবের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এ নতুন যুগান্তকারী উদ্ভাবন সম্পর্কে জেনে রাখা ভাল।

আশা করি ব্লগ পড়ে বিটকয়েন সম্পর্কে আপনি প্রাথমিক ধারণাগুলো খুব ভালো ভাবেই অর্জন করতে পেরেছেন। এরকম নানান ধরণের চমকপ্রদ সব ব্লগ পড়তে নজর রাখুন প্রতিদিন.ইনফো এর ওয়েবসাইট এবং ফেইসবুক পেইজে।

কেমন লাগলো আমাদের আজকের লেখাটি? কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। নতুন কোন কিছু নিয়ে জানতে চাইলে আমাদের জানাতে পারেন। প্রযুক্তি নিয়ে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে আমাদের সাথে থাকুন। চোখ রাখুন আমাদের ফেইসবুক পেইজে এবং প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য যোগ দিন আমাদের ফেইসবুক গ্রুপে।

জ্ঞান চর্চা চলুক অবিরাম, প্রতিদিন

Reference
the history of bitcoin
Craig Steven Wright

প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করার জন্য রয়েছে

আমাদের কমিউনিটি

প্রযুক্তি নিয়ে আমরা আলোচনা করতে চাই সব সময়। তাই আমাদের কমিউনিটিতে আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণ প্রযুক্তির সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য। আপনাদের যে কোন ধরনের সমস্যা, অজানা বিষয় গুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করতে প্রস্তুত সব সময়

কমেন্ট করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *