মহাকাশ ও বিজ্ঞান

ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলতে সক্ষম হল বিজ্ঞানীরা

April 25, 2019

ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলতে সক্ষম হল বিজ্ঞানীরা

১৯৭৪ সালে স্টিফেন হকিং ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব নিয়ে একটি থিউরিটিক্যাল আর্গুমেন্ট প্রদান করার পরেই বিজ্ঞানের জগতে শুরু হয়ে যায় ব্ল্যাকহোল নিয়ে তুমুল মাতামাতি। স্টিফেন হকিং দাবি করেন যে ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজনের আশেপাশে কোয়ান্টাম ইফেক্টের কারণে ব্ল্যাকহোল থেকে এক ধরনের ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশন নির্গত হয়। এই রেডিয়েশনের আবিষ্কারক স্টিফেন হকিং এর নাম অনুসারে রেডিয়েশন টির নাম দেয়া হয় হকিং রেডিয়েশন। স্টিফেন হকিং বিজ্ঞানের নতুন জগতের সেই যে সূচনা করে দিলেন, তারপর আর বিজ্ঞানীদের থামা থামির কোন নাম নেই। সবাই যেন উঠে পড়ে লাগলেন ব্ল্যাকহোল সম্বন্ধে জানার জন্য, ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলার জন্য।

কি এই ব্ল্যাকহোল, কিভাবে তৈরি হলো এটি, কিভাবে কাজ করে এটি, এটি দেখতেই বা কেমন, এমন নানা সব প্রশ্ন বছরের পর বছর ধরে ঘুরপাক খাচ্ছিল বিজ্ঞানীদের মাথায়। ২০১৯ সালের এপ্রিলের ১০ তারিখ প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের চোখের সামনে মেলে ধরলো নাসা। উন্মোচিত হলো সকল বিজ্ঞানীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্ল্যাকহোলের প্রথম চিত্র। প্রথমবারের মতো মানুষ দেখতে পারলো তাদের কল্পনার ব্ল্যাকহোল আসলে বাস্তবে দেখতে কেমন। এই ব্লগটিতে আলোচনা করা হয়েছে ব্ল্যাকহোলের এই প্রথম প্রকাশিত ছবিটি সম্পর্কে। ব্ল্যাকহোলের এই ছবিটির অদ্যপান্ত সম্পর্কে চলুন জেনে নেই আজকের ব্লগটি পড়ে।

ব্ল্যাকহোল

ব্ল্যাকহোল কি তা নিয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন
ব্ল্যাকহোলের আদ্যোপান্ত

ব্ল্যাকহোলের ছবি তোলার পূর্বপরিকল্পনা

২০১৭ সালে পুরো বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়াম সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা হাওয়াই থেকে শুরু করে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত ৮ টি টেলিস্কোপের স্ক্যানিং ক্ষমতাকে একত্র করে ফোকাস করে ব্ল্যাকহোলের একটি ছবি তুলবে। কিন্তু তত্ত্বানুসারে ব্ল্যাকহোল দেখা যায় না। কারণ ব্ল্যাকহোল এমন এক মহাকাশীয় বস্তু যার আশেপাশে সকল ধরনের বস্তুই এর মহাকর্ষ বলের কারণে এর উপর উপরিপাতিত হয়। ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষ বল এতটাই শক্তিশালী যে আলো পর্যন্ত এই মহাকর্ষ বল পেরিয়ে বের হতে পারে না। যেহেতু আলো আমাদের চোখে এসে পৌঁছায় না ব্ল্যাকহোল থেকে, সেহেতু আমরা ব্ল্যাকহোল দেখতে পারবো না। আইনস্টাইনের থিওরি অফ জেনারেল রিলেটিভিটি আমাদের ধারণা দিয়েছিল ব্ল্যাকহোল দেখতে কি রকম হতে পারে, কতগুলো ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব থাকতে পারে, তারা কিভাবে কাজ করে, তাদের অবস্থান কোথায় এবং মহাবিশ্বের সাথে তাদের সম্পর্ক কিরকম। এই ধারণা গুলোর উপর ভিত্তি করে আমরা অনুমান করে নিয়েছিলাম ব্ল্যাকহোল দেখতে কিরকম হবে। বাস্তবিক অর্থে এতদিন পর্যন্ত ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্বের কোন শক্তিশালী প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিছুদিন আগে পাওয়া গেল বহু প্রতীক্ষিত সেই প্রমাণ।

কী আবিষ্কৃত হল

এ বছরের এপ্রিলের ১০ তারিখ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জনসাধারণের জন্য একটি ছবি উন্মুক্ত করল। ছবিটিতে দেখা মিলল মেসিয়ার ৮৭ বা এম৮৭ তে অবস্থিত একটি ব্ল্যাকহোলের। ব্ল্যাকহোলটি দেখতে ছিল ঘোলা, মাঝে একটি কালো কেন্দ্র এবং চারপাশে হলুদাভ কমলা একটি ফ্রেম। অবাক করার মত বিষয় হচ্ছে এত বছর ধরে বিজ্ঞানীরা এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাকহোলের যেই ছবি কল্পনা করে এসেছিল, বাস্তবে ব্ল্যাকহোল দেখতে তার থেকে খুব একটা ভিন্ন নয়। ব্ল্যাকহোল টির আকার ছিল ৪০ বিলিয়ন কিলোমিটার জুড়ে। এটি ছিল পৃথিবী থেকে ৩ মিলিয়ন গুন বড়। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব ৫৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ। এক আলোকবর্ষ মানে হচ্ছে প্রায় ৯.৪৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার। ব্ল্যাকহোল টির আকার আমাদের পুরো সৌরজগৎ থেকেও বড়। ছবিটি ৬ টি গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং সহ রচনায় ছিলেন ৬০ টি প্রতিষ্ঠানের ২০০ জন এক্সপার্ট। এটি প্রকাশিত হয়েছিল অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারে বুধবারের।

কিভাবে তোলা হলো ছবিটি?

ভারী তারার পতনের ফলে ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি হয় এবং ডিস্কের পার্টিকেল গুলোর নিঃসৃত রেডিয়েশন গুলোর তাপমাত্রা বিলিয়ন বিলিয়ন ডিগ্রী হয়ে থাকে। এগুলো ব্ল্যাকহোলের চারপাশে আলোর বেগে ঘুরতে থাকে এবং শেষে মিলিয়ে যায়।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ইন্টারফেরোমেট্রি নামের একটি পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। এই পদ্ধতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ৮ টি টেলিস্কোপের সংগৃহীত রেডিয়েশনকে এমন ভাবে সংকলন করে যেন মনে হয় এটি একটি টেলিস্কোপ দ্বারাই সংগ্রহ করা হয়েছে। এই ভার্চুয়াল টেলিস্কোপটি যে চিত্র সংগ্রহ করে সেটি হচ্ছে ব্ল্যাকহোলের ইভেন্ট হরাইজন থেকে যেসব পার্টিকেল ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন হিসেবে নির্গত হয় সেগুলোর ট্রেইস। এই দুর্বল রেডিয়েশন গুলোর অধিকাংশই হচ্ছে রেডিও ওয়েভ। টেলিস্কোপের নজরে পড়ার জন্য ওয়েভ গুলোকে কয়েক ট্রিলিয়ন কিলোমিটার অতিক্রম করে আসতে হয়েছে। এটি অনেকটা চাঁদ থেকে পৃথিবীর একটি পিঁপড়ার ছবি তোলার মতো।

ই এইচ টি টিম তাদের আটটি ১ মিলিমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সংবেদী রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে পাঁচ রাত ধরে আমাদের মিল্কিওয়ে মধ্যবিন্দুতে থাকা এম৮৭ এবং স্যাজিটেরিয়াসে ব্ল্যাকহোলকে পর্যবেক্ষণ করে। টেলিস্কোপ গুলো হাওয়াই থেকে অ্যারিজোনা পর্যন্ত, মেক্সিকো থেকে স্পেন পর্যন্ত এবং চিলি থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যে ডাটা বের করা হয়েছিল টেলিস্কোপ গুলো থেকে সেগুলো এতটাই বিশাল ছিল যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ট্রান্সমিট করা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। এগুলোকে একটু ডিস্কে রেকর্ড করতে হয়েছে এবং বোস্টনে অবস্থিত ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি তে শিপিং এর মাধ্যমে পাঠাতে হয়েছে। দক্ষিণ মেরু থেকে ডাটা শিব করে পাঠাতে প্রায় এক বছরের মতো লেগে গিয়েছিল। সংগ্রহ করা ডাটার আকার ছিল ৪ পেটাবাইট। আট হাজার বছর এর এমপিথ্রি ফরমেটের মিউজিক অনবরত প্লে করার জন্য এই পরিমাণ ডাটা দরকার। ডাটাগুলোকে সুপার কম্পিউটার দ্বারা প্রসেস করতে বিজ্ঞানীদের দলকে ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টা করে শিফটে কাজ করতে হয়েছে। বিজ্ঞানীদের এই টিমটি স্যাজিটেরিয়াসে থেকে পাওয়া রিপোর্ট রেজাল্ট প্রকাশ করেনি কারণ এম ৮৭ এর ছবির মান তুলনামূলক অনেক ভাল ছিল।

অ্যালগরিদম টির পিছনে যার অবদান

ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপটি ইন্টারফেরোমেট্রি নামের যে পদ্ধতির উপর নির্ভর করে ব্ল্যাকহোলের ছবি তুলেছে এর কাজ হচ্ছে অনেকটা পুকুরের মধ্যে ঢিল পড়ার পর তার প্রান্ত থেকে ঢেউগুলো মাপার মত। ই এইচ টি তে যে আটটি টেলিস্কোপ ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোর প্রত্যেকটি থেকে প্রাপ্ত ডাটা একত্র করে একটি ভিজুয়াল পিকচার তৈরি করা হয়েছে।

এত বিশাল পরিমাণে ডাটাকে প্রসেস করে একটি ভিজুয়াল পিকচারে পরিণত করার জন্য এবং ডাটা গুলো থেকে নয়েজ গুলোকে ফিল্টার করার জন্য কঠিন কিছু অ্যালগোরিদমের প্রয়োজন ছিল। ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি তে অধ্যয়নরত কেটি বউমেন একটি নতুন অ্যালগরিদম তৈরি করে ফেলেন যেটি দ্বারা সম্পূর্ণ ই এইচ টি নেটওয়ার্কে সংগৃহীত ডাটাগুলোকে জোড়া লাগানো যায়। কেটি বউমেন তার অ্যালগোরিদমকে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর করার জন্য অনেকগুলো টেস্ট চালিয়েছেন। এক পর্যায়ে তাদের চারটি পৃথক দলে ভাগ হয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয়েছে যেন তারা তাদের ফাইন্ডিং সম্পর্কে সুনিশ্চিত হতে পারেন।

যে ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব কথা যেসব মানুষ আগে কল্পনাও করতে পারত না, আইনস্টাইন এবং স্টিফেন হকিং এর থিউরি গুলো যাদের কাছে এতদিন ছিল হাস্যরসের বস্তু, তারাই আজ ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব এবং পূর্বে উল্লেখিত দুই বিজ্ঞানীর থিউরি বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। এগুলো সবই সম্ভব হয়েছে কিছু চমৎকার বিজ্ঞানের নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি ছবি তোলার ফলে। ব্ল্যাকহোলকে আমরা এতদিন অদৃশ্য বলে ভাবতাম। কিন্তু সেই অদৃশ্য কেউ আমাদের চোখে ধরা দিতে আমরা বাধ্য করেছি। বিজ্ঞানের এক চমৎকার যুগে আমরা বাস করছি। মহাকাশের আরও এমন নিত্য নতুন চমকপ্রদ আবিষ্কার আমাদের সামনে চলে আসতে বোধহয় আর খুব বেশি দেরি নেই। এলন মাস্ক এবং তার স্পেস এক্স এর মঙ্গল গ্রহে মানুষের জীবন যাপনের উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন দেখে যারা হাসাহাসি করছি, তাদেরও হাসি থেমে যাওয়া খুব বেশি দেরি নেই। মহাকাশ জয়ের এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। এই যুগে বসবাস করতে পেরে আপনি নিজেকে ভাগ্যবান দাবি করতেই পারেন।

কেমন লাগলো আমাদের আজকের লেখাটি? কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। নতুন কোন কিছু নিয়ে জানতে চাইলে আমাদের জানাতে পারেন। প্রযুক্তি নিয়ে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে আমাদের সাথে থাকুন। চোখ রাখুন আমাদের ফেইসবুক পেইজে এবং প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য যোগ দিন আমাদের ফেইসবুক গ্রুপে।

জ্ঞান চর্চা চলুক অবিরাম, প্রতিদিন

Image Credit: Nasa

News Source: Nasa

প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করার জন্য রয়েছে

আমাদের কমিউনিটি

প্রযুক্তি নিয়ে আমরা আলোচনা করতে চাই সব সময়। তাই আমাদের কমিউনিটিতে আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণ প্রযুক্তির সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য। আপনাদের যে কোন ধরনের সমস্যা, অজানা বিষয় গুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করতে প্রস্তুত সব সময়

কমেন্ট করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *